জুলাইয়ের অংশীদার অনেকেই। আপাতদৃষ্টিতে ঐক্য সত্ত্বেও সবার গল্প যে ধীরে ধীরে ভিন্নতা পাবে সেটা অভ্যুত্থানের পর নিশ্চিত ছিলাম।
জাতীয়তাবাদী দল, বৈষম্যবিরোধী নেতারা কিংবা ইসলামি দলগুলো যেমন জুলাইয়ের অংশীদার, তেমনই অংশীদার তারাও, যারা এখন আর জুলাই নিয়ে কথা বলে না।
আমরা গণমানুষের জুলাই নিয়ে একটা কাজ করতে চেয়েছি। সিদ্ধান্ত ছিল, কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কাছ থেকে পয়সা নেব না। আর্থিক সহায়তা করলে বয়ানে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসে; আমরা চাইনি সেটা হোক।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে রিসার্চ শুরু করলাম। অর্থায়নের জন্য অনলাইনে প্রচারণা চালিয়েছি। একটি ম্যাগাজিন বের করেছি, বোধ সংযোগ। বিক্রি করে পয়সা তোলার যতটা না ইচ্ছা ছিল, তার চেয়ে বেশি উদ্দেশ্য ছিল: কেউ আর্থিক সহায়তা করলে তাকে এক কপি উপহার দেব।
ছবি শ্যুট করেছি ক্লাস, পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে। এই বছর কুরবানির সময় থেকে একটানা এডিট করে কাজ শেষ করেছি।
"ইতিহাসের ভাষ্য তৈরি করতে প্রথমেই প্রয়োজন রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি এদের সরিয়ে সেইসব সাধারণ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনায় মনোনিবেশ করা, যেগুলো সাধারণ মানুষকে তাড়িত করেছিল।"
জুলাই ডায়েরিজকে কেন আমরা বলছি 'জনতার জুলাই', সেটা বুঝতে উপরের উদ্ধৃতিটা জরুরি।
- জুলাই কি মেটিক্যুলাস প্ল্যানের অংশ?
- এর পেছনে মার্কিন অর্থায়ন ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করেনি, আমরা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি?
- এটি কি ৭১-এর ধারাবাহিকতা, নাকি জুলাই ও ৭১ একে অপরের পরিপন্থি?
- জুলাই নিয়ে আশাবাদী হবার সুযোগ কই?
- অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনতার অধিকাংশ কি ডানপন্থী ছিল? তাহলে এর অর্থ কী দাঁড়ায়?
- শেখ হাসিনাকে হটিয়ে আমরা আদৌ নতুন কিছু কি পেলাম?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একেকজনের কাছে একেকরকম। এই ছবি প্রশ্নগুলোর উত্তর হাজির করার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশগুলো করার চেষ্টা করেছে আপামর জনতার জায়গা থেকে।
তবে একটা ছবি একাই গোটা অভ্যুত্থানকে ডিফেন্ড করবে, এমনটাও নয়। অভ্যুত্থান ছিল স্বতঃস্ফূর্ত জনবিস্ফোরণ, যার ফলে হাসিনাশাহি ও তার রাজনীতি চিরতরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু অভ্যুত্থানের অর্জনকে টেকসই করতে প্রয়োজন শিল্প-সাহিত্যে তাকে ধরে রাখা। প্রচুর গল্প, উপন্যাস, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক কাজ হওয়া চাই।
এই ছবি সেই বড় দেয়ালে একটা ইটের গাঁথুনি মাত্র।জুলাইয়ের পর জুলাইয়ের নামে অপরাজনীতি হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে, কিছু মহল চতুরভাবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে নিয়েছে। কিন্তু ভাঙচুর আর কোলাহলের রাজনীতি দিয়ে অভ্যুত্থানের অর্জন টেকানো যাবে বলে মনে করি না।
তাই এই যাত্রায় আমাদের অংশীজন হোন। এই ছবি আমরা নিয়ে যেতে চাই মাঠে-ঘাটে-মফস্বলে, অভ্যুত্থানকারী সে সকল সাধারণ নাগরিকের কাছে। জুলাইয়ের গ্রাফিতি ও স্লোগানে ওঠা দাবিগুলো সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে চাই।
আমরা প্রদর্শনী করতে চাই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ছবিটি নিয়ে যেতে চাই শ্রমিকদের কাছে, মেহনতি আপামর জনতার কাছে।
অডিটোরিয়ামের আর্টফিল্ম হওয়া থেকে এই ছবিকে রক্ষা করুন।
'জুলাই ডায়েরিজ' নির্মাণ করা হয়েছে একক অর্থায়নের বাইরে গিয়ে। প্রদর্শনীতেও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ থাকবে। বাংলাদেশ বা দেশের বাইরে চলচ্চিত্র সংসদ, কালচারাল ক্লাব কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগেও যারা প্রদর্শনী করতে চান, আমাদের জানান। আপনাদের নিজ নিজ সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আয়োজনের অংশ হিসেবেও এই ছবি দেখাতে পারেন।
আমরা চাই যত বেশি সম্ভব উন্মুক্ত প্রদর্শনী করতে। আমাদের এই আহ্বান ছড়িয়ে দিন।
জুলাইকে, তার হাজার হাজার শহিদ ও আহতদের ত্যাগকে, এই জুলাইয়ের রাজনৈতিক শিক্ষাকে আমরা বিলুপ্ত হতে না দিই আমাদের সামগ্রিক স্মৃতি থেকে।