হোম/ডায়েরি / ব্লগ/বর্তমান লেখা
ঘোষণা / বক্তব্য

জনবিতর্ক: জুলাইয়ের দোদুল্যমান ঐক্যে আমাদের দায়

২৪ এর অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বিস্ময়কর দিক বোধহয় এই যে, ‘উই হেইট পলিটিকস’ ট্রেন্ড থেকে শুরু হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কীভাবে তীব্রভাবে রাজনীতি সচেতন করে তুলেছিল এই আন্দোলন...

লিখন দত্তলেখক
জুলাই ২০২৬প্রকাশ
~৬ মিনিটপড়ার সময়

‘২৪ এর অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বিস্ময়কর দিক বোধহয় এই যে, ‘উই হেইট পলিটিকস’ ট্রেন্ড থেকে শুরু হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কীভাবে তীব্রভাবে রাজনীতি সচেতন করে তুলেছিল এই আন্দোলন।

জুলাইয়ের প্রথমার্ধের পুরোটাই ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে প্রত্যক্ষ করেছি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কতৃক জনগণের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিপীড়ন তথা স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছাত্ররা কী করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘রাজনীতি মুক্ত’ করার ‘বিশেষ’ তাগিদ অনুভব করেছে ও মিছিলের স্লোগান, প্রকাশিত বিবৃতি ও সোশাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো দমন পীড়নে সরাসরি নিয়োজিত হতে শুরু করে, তখন রাজনীতি বিমুক্তকরণের মত প্রাথমিক দাবীগুলো ছাপিয়ে গণআকাঙ্ক্ষা সরকার পতনের দিকে মোড় নিতে থাকে। ৩৬ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতাগোষ্ঠির সাথে এদেশের ছাত্র জনতার তীব্র সংঘাত ও প্রতিরোধ তাকে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন ও সরব করে তুলেছিল এবং গত কয়েক নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা তরুণ তরুণীদের political space-এ তাদের স্বর নিশ্চিত করার জায়গাটা তৈরি করে দিয়েছিল।

এরই প্রমাণ পাই ৫ই আগস্টের পরপর কয়েকদিন যখন দেশে কোনো সরকার ছিল না:

  • ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাত জেগে পাড়া-মহল্লা ও কিছু কিছু জায়গায় সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উপাসনালয় পাহাড়া দেয়া।
  • ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে দেশব্যাপি ট্রাফিক ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার মত কাজ।
  • অভ্যুত্থান পরবর্তী দেওয়ালে দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নবগঠিত সরকার ও জনমানসে নিজেদের দাবী ও আকাঙ্খাগুলোর চিত্রকে স্পষ্টরূপ দেওয়া।

আন্দোলনকারী ছাত্রদের বৃহৎ অংশ জুলাই পরবর্তী সময়ে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও গ্রাফিতি আঁকার মত কিছু কিছু দ্বায়িত্ব সম্পাদনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাজীবনে ফেরত গেছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেহেতু চলচ্চিত্র পঠন পাঠন ও অনুশীলনে আগ্রহী, অভ্যুত্থানে ‘আমাদের’ দৃষ্টিকোণ তুলে ধরবে এমন একটি ছবি তৈরি করা সেসময় ঐতিহাসিক দ্বায়বদ্ধতা হিসেবেই হাজির হয়েছিল।

প্রশ্ন ওঠে, এই ‘আমরা’ কারা?

আমাদের ডকুফিল্মের এই ‘আমরা’ হচ্ছে ছাত্র-জনতার সেই বৃহদাংশ, দেশ প্রশ্নে যারা সর্বদা ছাড় দিতে প্রস্তুত। অভ্যুত্থানের পর ঘুরে ঘুরে বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তন্মধ্যে নির্দিষ্ট পার্টির সঙ্গে যাদের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ জড়িত (ছাত্রদের নতুন দল সংশ্লিষ্ট অনেকেও), তারা বাদে সমর্থক থেকে শুরু করে রাজনীতি নিয়ে নির্লিপ্ত এমন অসংখ্য মানুষের মধ্যেই একটা কমন প্যাটার্ন পেয়েছি – বলা চলে অনেকটা স্ববিরুদ্ধই – দেশ প্রশ্নে একটা সুপ্ত ঐক্য ও জুলাই পরবর্তী শঙ্কা ও হতাশা।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মনোভাব একরৈখিক কোনো বিষয় নয়। তবে মোটাদাগে আমার মতামত এই যে:

জুলাই এ যে ঐক্য আমরা দেখেছি তা মূলত দল-মত-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে নিপীড়িত মানুষের ঐক্য; আর জুলাই পরবর্তী যে বিভাজন দেখেছি তা রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন।

দেশের সাধারণ মানুষ ‘২৪ এর জুলাই-আগস্ট মাসে যে বিশাল প্রাণ উৎসর্গ করতে হয়েছে সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; এর বিনিময়ে ‘২৪ পরবর্তী নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচার ও সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতির অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার ভাগবন্টনের পুরনো বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়া তাকে সামগ্রিক নিরাশার দিকে ঝুকিয়েছে এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, এবং কার্যতই এই নিরাশা রাজনৈতিক অনৈক্যকে আরো দৃশ্যমান রূপ দিয়েছে।

তবু, আমরা তরুণরা অন্তত আশা হারাতে পারি না। ৫ই আগস্ট আমাদের প্রজন্মের জন্য বহু সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে বলে মনে করি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সক্রিয় স্বৈরাচার ও তার কর্মীবাহিনীর পতন যে জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সম্ভব, তা একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক শিক্ষা আমাদের জন্য।

৫ই আগস্ট পরবর্তী ভাবনায় দেশের তরুণ জনমানসের প্রতি আমার ব্যক্তিগত প্রস্তাবনা এই যে, আসুন আমরা সক্রিয় হই। দেশ (সীমানা নয়, জনগণ ও তার সার্বিক কল্যাণ অর্থে) গড়তে নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সামান্য ভূমিকা রাখতে পারলেও এই জনপদ ও তার মানুষের ভাগ্যরেখার পরিবর্তন সম্ভব। কিছুদিন আগে মজা করে একটা কথা বলেছিলাম, চায়নার মত হতে চায়না চলে যাওয়া হলো ‘প্রক্সি চায়না’, নিজ দেশকে চায়না হিসেবে গড়ে তোলা হলো ‘রিয়েল চায়না’। আদতে সেই কথাই। জুলাই আমাদের আগাছার পাশাপাশি বহু সক্রিয় চিন্তক, কর্মী ও এক্টিভিস্ট দিয়েছে যাদের ওপর জনগণ আস্থা রাখতে পারে। বিপরীতধর্মী বহু বীজই জুলাইয়ে চারা গজানোর সুযোগ পেয়েছে যার ফলাফল আসছে বছরগুলোতে আমরা দেখতে শুরু করবো।

এবার আসি আমাদের ছবির কথায়।

অভ্যুত্থান পরবর্তী আমাদের ডকুফিল্মের প্রয়োজনীয়তা কী? এ মূলত সরকারি, বেসরকারি প্রযোজনায় যা ছবি হচ্ছে তার বাইরে গিয়ে গণঅর্থায়নে অভ্যুত্থানকারী জনতার নিজের বয়ানকে ইতিহাসের সামনে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

ছবিতে অর্থ একটা বিরাট ফ্যাক্টর, তবে আমরা একটা সহজ হিসাব কষে দেখেছিলাম প্রাথমিক যন্ত্রপাতিগুলো যেহেতু আমাদের নাগালের মধ্যে আছে কেবল যাতায়ত খরচ, আবাসন ও পোস্ট প্রডাকশনের কিছু টেকনিক্যাল খরচ যোগাড় করতে পারলেই এই ছবি শেষ করা সম্ভব, এবং তাও খুব অল্পতেই।

তাই, নেমে পড়লাম। সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রথম ধাপের প্রচারণা চালালাম এবং আত্মবিশ্বাস ছিল কাজ হবে। অনলাইনে অফলাইনে পরিচিতজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আমরা অনুরোধ করেছি নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে এবং উদ্যোগটুকু ছড়িয়ে দিতে।

অবাক করা ব্যাপার এই যে প্রথম ধাপের প্রচারণায় টাকাগুলো যে জায়গা থেকে আসবে ভেবেছিলাম সেখান থেকে আসেনি, এসেছে বরং অপরিচিত জায়গা থেকে। সাধারণ মানুষের যে আমাদের কাজের ওপর আস্থা আছে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ পেলাম তখনই।

এটা সত্য যে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কাজ করা দিন দিন চ্যালেঞ্জিং হয়ে আসছে। সিনেমা করা খুবই সময়সাপেক্ষ কাজ এবং তার ওপর ক্লাস, পরীক্ষা, টিউশনের ফাঁকে সকলের সময় বের করে শ্যুট করতে যাওয়া কাজটাকে আরো কঠিন করে দেয়। ফলে ধীর কিন্তু চলমান রূপে আমাদের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক অন্যান্য কাজের সঙ্গে পাল্লা দেয়া কিংবা বিনোদন দিয়ে দর্শকমনকে তুষ্ট করার জন্য এই কাজে আমরা নামিনি, নেমেছি ইতিহাস বিবেচনায় অভ্যুত্থানের সেই স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখার তাগিদ থেকে।

তবে দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। যত দিন যাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ক্রমশ ভিন্ন থেকে ভিন্নতর রূপ নিচ্ছে। এক বছর আগে মানুষের যে আস্থা ও আকাঙ্খা ছিল, তা আর আগের জায়গায় নেই। কেবল যদি টাকাপয়সার বিষয়টাও ধরি, দ্বিতীয় ধাপের গণঅর্থায়ন শুরু করলে মানুষের কাছ থেকে কতটা সাড়া পাব, তাই নিয়ে আমরা কিছুটা সন্দিহান। প্রথম ধাপের টাকায় আমরা অনেকদূর শ্যুট করেছি, ফলে ছবি শেষ করতে চাইলে অর্থ প্রয়োজন হবেই, এবং তাও খুব শীঘ্রই।

চাই এই বছরের মধ্যে ছবিটা শেষ করে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করতে। কাজের সততা ও নিষ্ঠা জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারলে সন্দেহাতিতভাবেই তারা এগিয়ে আসবেন, তবে বর্তমানে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই প্রক্রিয়ায় কতটা সফল হবো, দ্বিধা থেকে যায়।

আশা হারালে চলে না। ফরাসি চিত্রপরিচালক রবার্ট ব্রেসঁ তার একটি ছবির সমাপ্তিতে মূল চরিত্রের করুণ পরিস্থিতির কারন দর্শাতে গিয়ে একটা কথা বলেছিলেন:

"There can be no hope without despair. Despair can be and should be pushed very far so that hope can arise."

Robert Bresson

কথাটা বুঝতে আমার জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

চট্টগ্রামের বন্ধু সুলাইম ও ওয়ালী ২৪ এর নির্বাচনকালীন ঘটনা মনে করে সেদিন বলছিলো, ভোটের দিন অন্য অনেকের মত এই অগণতান্ত্রিক নির্বাচন তারা বয়কট করেছে। তবু সামগ্রিক অসহায়ত্ব থেকে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কী সুতীব্র বিষন্নতা সেদিন তাদের ঘিরে ধরেছিল, তা সকলেই অনুভব করতে পারলাম। তার কয়েকমাস পরেই তো সরকার পতন হয়ে গেল। যখন সবাই ভেবেছিল এটা অসম্ভব ঠিক তখনই এবং কোটার মত একটা ইস্যু ধরে।

আগেও বলেছি ২৪ এর অভ্যুত্থান আমাদের প্রজন্মের জন্য অনেকগুলি শিক্ষা নিয়ে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম বোধহয় সাহস বজায় রাখা ও আশা না হারানোর শিক্ষা। এই কারনেই এই ছবি আমরা শেষ করবো এবং যেকোনোরূপে জনগনের কাছে করা ওয়াদা রক্ষা করব, এর ব্যতিরেকে কোনো গত্যান্তর নেই।

জুলাই ডায়েরিজঘোষণা / বক্তব্য
# জনতার জুলাই# গণ-অর্থায়ন# ডকুফিল্ম# চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন / READ NEXT

এই ছবির প্রদর্শনী করতে চান
আপনার এলাকায়?

প্রদর্শনীর অনুরোধ পাঠান →