হোম/ডায়েরি / ব্লগ/বর্তমান লেখা
ঘোষণা / বক্তব্য

আমাদের জুলাই ডায়েরিজ

জুলাইয়ের ওপর ডকুফিল্ম বানানোর কথা যে মুহূর্তে ঠিক হলো, তখন আর যাই করি এই কাজে আমার নামবার কথা নয়। সবে একটা তান্ডবময় বছর শেষ হয়েছে... তবুও বন্ধুরা যখন ভাবলো, একমুহূর্ত ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম।

টিম জুলাই ডায়েরিজলেখক
জুলাই ২০২৬প্রকাশ
~৭ মিনিটপড়ার সময়

জুলাইয়ের ওপর ডকুফিল্ম বানানোর কথা যে মুহূর্তে ঠিক হলো, তখন আর যাই করি এই কাজে আমার নামবার কথা নয়।

সবে একটা তান্ডবময় বছর শেষ হয়েছে। দেশের উত্তপ্ত political পরিস্থিতি, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান, তৎপরবর্তী মাসগুলোর শঙ্কা ও উৎকণ্ঠাময় সময় পার করে বছর শেষের ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় যখন বসলাম, অক্লান্ত পরিশ্রম আর রাতজাগা খাটুনি মিলিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে কিছু চিন্তা করার অবসর ছিল না। পরীক্ষা যখন শেষ হলো তখন একান্ত প্রয়োজন ছিল শান্ত কয়েকটা ছুটির দিন আর ব্যাঘাতহীন নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের।

সেই মুহূর্তে বন্ধুরা যখন ভাবছিলেন, জুলাইয়ের ওপর একটা ডকুফিল্ম করা যায় কিনা, একমুহূর্ত ভেবে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম। ছুটির দিন ভেস্তে গেছে যাক, দুদিন বিশ্রাম নিয়ে ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে ঢাকা পাড়ি দিলাম, রিসার্চ ও ফিল্ডওয়ার্কের উদ্দেশ্যে।

যে সময়ে আমরা এই ছবি করছি, তখন আরো বহু ছবি হচ্ছে জুলাইয়ের ওপর, সরকারি ও বেসরকারি প্রণোদনায়। তবে খবর পাচ্ছি ছবি যা হচ্ছে তা খুব একটা পাতে তোলার মত নয়, এবং তারচেয়েও বড় কথা: কাজ যা হচ্ছে তা সূক্ষ্মভাবে কোনো না কোনো গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন প্রকল্পেরই নামান্তর।

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে অভ্যুত্থানকারী সাধারণ জনতার দৃষ্টিকোণ তুলে আনার দায়িত্ব কারো না কারোর ওপর বর্তায়।

জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের আপামর ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান করেছে। স্বৈরাচার পলায়নের পর দেশ ছিল অরক্ষিত, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক রূপ কাটিয়ে উঠতে বহু সময় নিয়েছে। এরমধ্যে দেশের আশঙ্কাময় পরিস্থিতি, পাহাড়ি জেলা ও ফেনী-নোয়াখালী অঞ্চলে নেমে আসা ভয়াবহ বন্যা, পুলিশ প্রশাসন অকার্যকর হয়ে পড়ার পর অরক্ষিত পাড়া-মহল্লা রাত জেগে পাহাড়া দেওয়া থেকে শুরু করে ট্রাফিক পুলিশের জায়গা নিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অটল রাখার কাজ ছাত্রজনতাকে ঘরে ফিরতে দিচ্ছিল না।

আস্তে আস্তে পরিস্থিতি যখন কিছুটা শিথিল হতে শুরু করলো, অভ্যুত্থানের গণআকাঙ্ক্ষাকে একটা কাঠামো দেয়ার প্রচেষ্টা থেকে জুলাই-আগস্টের ছাত্রদের নেতৃবৃন্দ দল গঠন করলেন এবং আমরাও ধীরে ধীরে ঘরে ফিরতে শুরু করলাম। কেউ কেউ বিভিন্ন দলে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় হলেন, আর আমরা যারা কোনো নির্দিষ্ট দলে যোগ দিইনি, খেয়াল করতে শুরু করলাম:

জুলাইয়ের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমেই সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে। এমনকি এর বয়ানও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে।

জুলাইয়ের ১ দফা সবার ঐক্যকেই চিত্রিত করে এবং তা ছিল চিরতরে স্বৈরাচার পতন ও বৈষম্যের অবসান। কিন্তু একটা স্বাধীন সার্বভৌম জনগোষ্ঠীর এই সুবিশাল চাওয়াকে যখন পার্টিজান কাতারে ফেলে অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বচসা শুরু হয়, সদ্য ঘরে ফেরা এই দেশের মুক্তিকামী আপামর জনতার দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

তবে আমার বিশ্বাস জুলাই পুরো একটা জেনারেশনের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সদিচ্ছাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এক স্বৈরাচারের পতন যখন সম্ভব হয়েছে, তখন কিছুই আর অসম্ভব থাকার কথা নয়, অন্তত আমাদের তরুণ মানসপটে।

কিন্তু আমরা তো ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরের লোক, আমরা কীভাবে জুলাইয়ের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখতে ভূমিকা পালন করতে পারি?

উপরের প্রশ্নটার একটা উত্তর আছে। ছোটো একটা গল্প বলি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় জাঁ লুক গদার ভিয়েতনাম কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন সেখানে গিয়ে দৃশ্যধারণ করতে, কিন্তু ফ্রান্সের ভিয়েতনাম দূতাবাস অনুমতি দেয়নি। তারা গদারের বাম সংস্পর্শ বশত তার রাজনৈতিক অভিলাষ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছিলেননা।

তখন গদার ভাবলেন, তিনি প্যারিসে বসা এক তরুণ চিত্রপরিচালক, তার সাথে ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণি ও আদর্শগত বহু বিভেদ আছে, যা তাকে তাদের সমকাতারে দাঁড়িয়ে অস্ত্র তুলে নিতে দেবে না, যদিও উভয়ের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষায় কোনো ফারাক নেই। তখন গদার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে:

"আমাদের চারপাশে অসংখ্য ছোটো ছোটো ভিয়েতনাম আছে, নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিজের ভেতরে একটি ভিয়েতনাম তৈরি করতে হবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।"

Jean-Luc Godard

গদার বলেন, “আপনি যদি গিনির পক্ষে থাকেন, পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন; শিকাগোতে থাকলে কালোদের পাশে দাঁড়াবেন; দক্ষিণ আমেরিকায় থাকলে উপনিবেশিত লাতিন আমেরিকার পক্ষে কথা বলবেন।”

এখানের মূল কথাটা হলো: আমরা যে যাই করছি, তার মধ্য দিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ ও বাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করা। আমি ইংরেজি সাহিত্যের সামান্য এক ছাত্র, সিনেমায় আগ্রহী। তাই আমার জায়গা থেকে জুলাইকে ধরে রাখার একমাত্র উপায় তার ওপর ছবি তৈরি করা।

জুলাইয়ের সর্বময় কোনো বয়ান হাজির করা আমাদের সাধ্যের বাইরে, লক্ষ্যও নয়। বড় বড় বয়ান, মাস্টারমাইন্ড ন্যারেটিভ ও রাজা-রাজড়া, সভাসদ, উজির-নাজিরের ফিরিস্তি বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের জায়গা থেকে সাধারণ জনতার দৃষ্টিকোণ তুলে আনাই আমাদের উদ্দেশ্য।

ছবির প্রস্তাবে রাজি হবার আরও একটা কারণ আছে। তা হলো সিনেমার বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের বোধ সংযোগ টিমের পারদর্শিতা। আমরা ক্যামেরা চালাতে পারি, ছবি এডিট করার সব যন্ত্রপাতিও আমাদের কাছে আছে। ফলতঃ শুধুই থাকা-খাওয়া আর পরিবহন খরচ সহ সামান্য কিছু টেকনিক্যাল খরচ ছাড়া আর কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই। সিনেমার কাজে জড়িত টেকনিক্যাল টিমের কেউই কোনো পারিশ্রমিক নিচ্ছে না।

সুতরাং এই মাপের একটা ছবি (পূর্ণদৈর্ঘ্য, ৮০ মি.) করতে যেখানে ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকার বাজেট দরকার হয়, সেখানে আমাদের প্রয়োজন মাত্র ৩ লক্ষ টাকা।

পাশাপাশি আরেকটা বিষয়ও আমাদের খেয়াল রাখতে হয়েছে। ছাত্রজনতা এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে, সুতরাং আমাদের একটা সর্বময় access আছে, যাকে কাজে না লাগানো বোকামি।

বিবিসি বা আলজাজিরা থেকে কেউ এই ডকু করতে এলে তাকে যে পরিমাণ বাধা, ভোগান্তি ও মিসকমিউনিকেশন পেরিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করতে হতো, তার তুলনায় আমরা কয়েকশ গুণ সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। ডকুমেন্টারি ছবিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: আপনি যাদের চলচ্চিত্রে আবদ্ধ করবেন, তাদের সাথে আপনার আস্থা ও যোগাযোগ কতটুকু।

ঢাকায় কয়েক দফা ফিল্ডওয়ার্ক করে বুঝতে পেরেছি, এখানে তেমন কোনো কারিকুরি ও টেকনিক্যাল চৌকশের দরকার হবে না। কেবল অন্তরের সততা ও সদিচ্ছা এবং সঠিক জায়গায় ক্যামেরা তাক করতে পারা, এই দুইয়ের সংযোগ ঘটলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিজেই নিজেকে পরতে পরতে উন্মোচন করতে রাজি আছে আমাদের সামনে।

বাংলাদেশে বসবাসরত যেকোনো মানুষ জানেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। যত দ্রুত এই ছবির কাজ শেষ করা যায়, তত মঙ্গল। ৫ই আগস্ট আমাদের মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

ছবির অর্থায়নের জন্য আমরা কেবলই ব্যক্তিনির্ভর গণঅর্থায়নের ওপর ভরসা করছি, আশা করি খুব দ্রুতই টাকাটা উঠে যাবে। এই দেশের আঠারো কোটি মানুষ যারা জন্মলগ্ন থেকেই কোনো নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ও স্বৈরাচারকেই চিরস্থায়ী হতে দেয়নি, তাদের ওপর এইটুকু বিশ্বাস না রাখার পাপে অংশীদার হতে চাই না।

সব দেশে, সবসময় ইতিহাসের পঠন পাঠন ও পুনর্বিবেচনার গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসকে কেবলই রাজা-রাজড়া ও সৈন্য সামন্তের ফিরিস্তি থেকে বের করে সাধারণ গণমানুষের বয়ানরূপে তৈরি ও হাজির করবার সময় এসেছে।

এজন্যই আমাদের আর্কাইভিং এর কাজে নামা। বোধ সংযোগ ইতোমধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানের টাইমলাইন বের করেছে, বর্তমানে বইটির একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্করণের কাজ চলছে, পাশাপাশি এই ছবি।

আজ থেকে কুড়ি কিংবা ত্রিশ বছর পর বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী যখন ২০২৪ এর অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থানের দিকে ফিরে তাকাবে, এই কাজগুলো আশাকরি তাদের আপন স্পর্ধা, শক্তি ও সক্ষমতা আরেকবার মনে করিয়ে দিয়ে যেকোনো সংকটকালে নিজের ওপর আস্থা ফেরাতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্যেই আমাদের যাবতীয় প্রচেষ্টা!

জুলাই ডায়েরিজঘোষণা / বক্তব্য
# জনতার জুলাই# গণ-অর্থায়ন# ডকুফিল্ম# বোধ সংযোগ

আরও পড়ুন / READ NEXT

এই ছবির প্রদর্শনী করতে চান
আপনার এলাকায়?

প্রদর্শনীর অনুরোধ পাঠান →